অর্থনীতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অর্থনীতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২৩

এইচএসসিতে পাস ও জিপিএ ৫ কমার তিন কারণ

এইচএসসিতে পাস ও জিপিএ ৫ কমার তিন কারণ

 

ভালো ফলের খবরে আনন্দে মেতে ওঠে শিক্ষার্থীরা। গতকাল রাজধানীর নটর ডেম কলেজে। ছবি : কালের কণ্ঠ

চলতি বছর এইচএসসি (উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট) ও সমমানের পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের পাসের হার গত বছরের তুলনায় ৭.৩১ শতাংশ কমেছে। জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থী কমেছে ৮৩ হাজার ৬৮৭ জন, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক।


সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিন কারণে বিগত বছরগুলোর তুলনায় ফল খারাপ হয়েছে। তবে শিক্ষামন্ত্রীসহ বোর্ড কর্মকর্তাদের দাবি, করোনার আগের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে ফল স্বাভাবিক ধারাতেই আছে।


গতকাল রবিবার সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে এইচএসসি-২০২৩-এর ফল প্রকাশ উদ্বোধন করেন। সকাল ১১টায় তা শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ফলের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন।


প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অনুকরণীয় বলে বিবেচনা করছে বিশ্বের অন্যান্য দেশ।


বর্তমানে দেশের শিক্ষার হার ৭৬.০৮ শতাংশ। করোনার কারণে ২০২১ ও ২০২২ সালে সব বিষয়ে পূর্ণ নম্বরে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা সব সময় আমাদের শুনতে হয়। এখন দেখছি উল্টো।


পরীক্ষায় জিপিএ ৫ ও পাসের হারে মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে। ছেলেদের পিছিয়ে থাকার কারণ খুঁজে বের করতে হবে।’

চলতি বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ১৩ লাখ ৫৭ হাজার ৯১৫ জন পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৮৫২ জন। অর্থাৎ পাসের হার ৭৮.৬৪ শতাংশ।


জিপিএ ৫ পেয়েছে ৯২ হাজার ৫৯৫ জন শিক্ষার্থী। গত বছর এইচএসসি-২০২২-এ শিক্ষার্থী পাসের হার ছিল ৮৫.৯৫ শতাংশ এবং জিপিএ ৫ পেয়েছিল এক লাখ ৭৬ হাজার ২৮২ জন পরীক্ষার্থী। অর্থাৎ বিগত বছরের তুলনায় পাসের হার কমার পাশাপাশি জিপিএ ৫ প্রাপ্তি কমে প্রায় অর্ধেকে নেমেছে।


সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যে তিনটি কারণে এবারের ফল গতবারের চেয়ে কিছুটা পিছিয়েছে, তা হলো করোনার পর এ বছর থেকে সব বিষয়ে পূর্ণ সিলেবাস চালু এবং পূর্ণ নম্বরে ও তিন ঘণ্টায় পরীক্ষা নেওয়া। এ ছাড়া ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য হওয়া এবং করোনার কারণে যথাযথ শ্রেণি পাঠদান না পাওয়ায় সেই ঘাটতি নিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ।


শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, ‘এর আগে করোনার কারণে ২০২১ ও ২০২২ সালে বিশেষ ছাড় দিয়ে পরীক্ষাগুলো নেওয়া হয়। এসব কারণে গত বছরের তুলনায় ফল খারাপ হয়েছে বলে মনে হতে পারে। তবে ২০১৯ সালের ফলের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে ধারাবাহিকতা ঠিক আছে।’


২০১৯ সালের ফলে দেখা যায়, পাসের হার ছিল ৭৩.৯৩ শতাংশ এবং জিপিএ ৫ পেয়েছে ৪৭ হাজার ২৮৬ জন।


যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. মো. আহসান হাবীব বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে ইংরেজি বিষয়ে। এতে পাসের হার ও জিপিএ ৫ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে অনেক শিক্ষার্থী।’


শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সাধারণ ৯টি বোর্ডের অধীনে বিভিন্ন বিষয়ের পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের উত্তীর্ণের হার ৯০ থেকে ৯৯ শতাংশ। অন্যদিকে ইংরেজি বিষয়ে উত্তীর্ণের হার ৭৭ থেক ৮৮ শতাংশ। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজি বিষয়ে অকৃতকার্য ১৩.১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী। এ ছাড়া রাজশাহীতে ১৬.৮২ শতাংশ, কুমিল্লায় ১৮.০২ শতাংশ, যশোরে ২২.৬৪ শতাংশ, চট্টগ্রামে ১১.০৯ শতাংশ, বরিশালে ১৩.৯৯ শতাংশ, সিলেটে ১৭.৮১ শতাংশ, দিনাজপুরে ১৭.২০ শতাংশ ও ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের ২৪.৬২ শতাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজিতে ফেল করেছে।


ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে থাকা একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা জানায়, বিগত বছরের তুলনায় এ বছর ভিন্ন আঙ্গিকে প্রশ্নপত্র হয়েছে। বিশেষ করে ইংরেজি বিষয়ে প্রশ্নপত্র তুলনামূলকভাবে কঠিন ছিল। এসব কারণে অনেক শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি।


পাস, জিপিএ ৫ কমেছে তিন কারণেঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বরাবরের মতোই প্রশ্নপত্র করেছি। এতে কী ভিন্নতা ছিল, তা শিক্ষার্থীরাই বলতে পারবে। এ ছাড়া ইংরেজি বিষয়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা বরাবরই দুর্বল।’


ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার কারণে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের যথেষ্ট সময় পায়নি। প্রস্তুতিতে ঘাটতি নিয়েই তারা পরীক্ষা দিয়েছে, যা তাদের ফলে কিছুটা প্রভাব ফেলেছে। আশা করি, আগামী বছর থেকে এ সমস্যা আর থাকবে না। তবে করোনার আগের ফলের সঙ্গে তুলনা করলে এই ফলকে খারাপ বলা যাবে না।’


৪২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী অকৃতকার্য


৪২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতভাগ শিক্ষার্থী এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অনুত্তীর্ণ হয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পাঁচটি, রাজশাহীতে চারটি, কুমিল্লায় একটি, যশোরে সাতটি, চট্টগ্রামে তিনটি, দিনাজপুরে ১৬টি, ময়মনসিংহে চারটি। মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে রয়েছে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।


শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৯৫৩টি। এর আগে ২০২২ সালে শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৫০। ২০২১ সালে এ সংখ্যা ছিল পাঁচ।


পাসের হার ও জিপিএ ৫-এ ছাত্রীরা এবারও এগিয়ে


শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাসের হার ও জিপিএ ৫ প্রাপ্তিতে এ বছরও ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা এগিয়ে। ছাত্রের চেয়ে ৩.৮১ শতাংশ বেশি ছাত্রী পাস করেছে এবং ছয় হাজার ১৩৫ জন বেশি ছাত্রী জিপিএ ৫ পেয়েছে।


উত্তীর্ণ ছাত্রসংখ্যা ছয় লাখ ৮৯ হাজার ২৩ জন, পাসের হার ৭৬.৭৬ শতাংশ ও জিপিএ ৫ পেয়েছে ৪৩ হাজার ২৩০ জন। উত্তীর্ণ ছাত্রীর সংখ্যা পাঁচ লাখ ৩৮ হাজার ৯৩৩ জন, পাসের হার ৮০.৫৭ শতাংশ ও জিপিএ ৫ পেয়েছে ৪৯ হাজার ৫৯৫ জন।


পাসের হারে বরিশাল এগিয়ে, পিছিয়ে যশোর 


সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাসের হারে পিছিয়ে পড়েছে যশোর শিক্ষা বোর্ড। বোর্ড কর্মকর্তারা জানান, ইংরেজি পরীক্ষা কঠিন হওয়ার কারণে অনেক শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত ফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এ কারণে এই বোর্ডে শিক্ষার্থীদের পাসের হার কমেছে, প্রভাব পড়েছে জিপিএ ৫ প্রাপ্তিতে। যশোর বোর্ডে পাসের হার ৬৯.৮৮ শতাংশ।


৮০.৬৫ শতাংশ পাসের হার নিয়ে প্রথম স্থানে বরিশাল শিক্ষা বোর্ড। শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে পাসের হার ঢাকায় ৭৯.৪৪ শতাংশ, রাজশাহীতে ৭৮.৪৬ শতাংশ, কুমিল্লায় ৭৫.৩৯ শতাংশ, দিনাজপুরে ৭৪.৪৮ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৭৪.৪৫ শতাংশ, সিলেটে ৭১.৬২ শতাংশ ও ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে ৭০.৪৪ শতাংশ। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৯১.২৫ শতাংশ ও মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৯০.৭৫ শতাংশ।


বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে


পাসের হারে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে। তাদের পাসের হার ৮৭.৮৪ শতাংশ। মানবিক বিভাগে পাসের হার ৭০.৭৯ শতাংশ ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৭৭ শতাংশ।

রবিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২৩

ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যেসব লেনদেন আয়করের আওতায় পড়বে

ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যেসব লেনদেন আয়করের আওতায় পড়বে

 বাংলাদেশে প্রতিবছর ৩০শে নভেম্বরের মধ্যে আয়করের রিটার্ন দাখিল করতে হয়। প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন জমা দেবার সময় ব্যাংকের হিসাব বিবরনী বা ব্যাংক স্টেটমেন্ট জমা দিতে হয়। ব্যাংক হিসেবে কোন লেনদেন আয়করের আওতায় পড়বে সেটি নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে।


আয়কর কর্তৃপক্ষের কাছে একজন করদাতার বার্ষিক আয়ের সংক্ষিপ্ত বিবরণ জমা দেয়াকে আয়কর রিটার্ন বলে। এখানে আয়, ব্যয় এবং সম্পদের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়। একজন মানুষের বার্ষিক আয় কত সেটার ভিত্তিতে তার ওপর কর আরোপ হয়।

যারা আয়কর রিটার্ন জমা দেন তাদের অনেকের ক্ষেত্রে স্যালারি অ্যাকাউন্ট বা চলতি হিসাব অ্যাকাউন্ট রয়েছে।

আইন অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি যখন তার আয়কর রিটার্ন জমা দেবেন, সেখানে সব ধরনের অ্যাকাউন্টের তথ্য জমা দিতে হবে।

কারও একাধিক ব্যাংক হিসাব থাকলেও আয়কর নথিতে সব অ্যাকাউন্টের তথ্য না দিয়ে শুধু একটি অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্ট দিয়ে রিটার্ন জমা দেন। সেক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায়, আয়কর নথিতে যে আয় দেখানো হয়েছে, তার চেয়ে ব্যাংক লেনদেন বেশি।

তাতেই বিপত্তিতে পড়ার শঙ্কা বেড়ে যায়। কারণ আয়কর নথি বিভিন্ন সময় পর্যালোচনা করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা।

যদি দেখা যায়, কেউ তার ব্যাংক হিসাবের তথ্য জমা দেননি, তখন সেটি অপ্রদর্শিত আয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তখন জরিমানা করার বিধান রয়েছে বলে জানিয়েছেন আয়কর আইনজীবীরা।

আয়কর আইনজীবী এবং সুপ্রিমকোর্টের অ্যাডভোকেট সাকিল আহমাদ জানান, আয়কর রিটার্নে যে আয় দেখানো হয়েছে, তার চেয়ে বেশি আয় বা অপ্রদর্শিত আয় পাওয়া গেলে তার ওপর জরিমানাসহ কর দিতে হয়।

এক্ষেত্রে আগে যে আয়কর পরিশোধ করা হয়েছে, তা যদি নতুন করে ধার্য করা করের ৭৫% এর কম হয়ে থাকে, তাহলে ১০ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে। তবে আগে পরিশোধ করা কর নতুন নির্ধারিত করের ৭৫ শতাংশের বেশি হলে আর জরিমানা হবে না।

মতিঝিলের ব্যাংক পাড়া।

ছবির উৎস,GETTY IMAGES

ছবির ক্যাপশান,

মতিঝিলের ব্যাংক পাড়া।

ব্যাংকে যে লেনদেন হবে তা অবশ্যই আয়কর নথিতে প্রদর্শিত আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অন্য কোন প্রকার লেনদেন হলে তার যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা থাকতে হবে।

ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত মোট সুদ বা মুনাফা অন্যান্য উৎসের আয় হিসেবে দেখাতে হবে। উৎসে কর প্রদেয় করের সাথে সমন্বয় হবে।

আইনজীবীরা বলছেন, ব্যাংক হিসাবের কোন তথ্য গোপন রাখা যাবে না। কর ফাঁকি রোধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে করদাতাদের ব্যাংক হিসাবের তথ্যে সরাসরি প্রবেশাধিকার চেয়েছে।

এর ফলে রাজস্ব বোর্ড করদাতা ও ব্যবসায়ীদের ব্যাংকিং লেনদেনের তথ্য খুব সহজেই জানতে পারবে, যা তাদের লেনদেন, ঋণ ও বিনিয়োগসহ সব ধরণের আর্থিক লেনদেন নজরদারিতে সহায়তা করবে।

তবে এতে ব্যাংকের গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা হুমকির মুখে পড়বে বলে অনেক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। আবার গ্রাহকদের মধ্যে ভীতি তৈরি হলে ব্যাংকে তারা নগদ টাকা রাখা বা লেনদেন কমে যেতে পারে। ফলে ব্যাংকগুলোয় তারল্য সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল ১৩ কোটি ৬২ লাখের মতো, যেখানে প্রায় ১৬ লাখ কোটি টাকা জমা ছিল । এরমধ্যে ১ কোটি টাকার উপরে লেনদেন হয়েছে, এমন অ্যাকাউন্টের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার।

এনবিআর-এর ভ্যাট অনলাইন প্রজেক্ট অফিসের হিসাব অনুযায়ী, দেশে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন (বিআইএন) নম্বরধারীর সংখ্যা ৪ লাখ ৫৭ হাজার, যার মধ্যে গত মাসে কর রিটার্ন জমা হয়েছে ৩ লাখের বেশি।

অর্থাৎ, বিআইএন হোল্ডারদের এক-তৃতীয়াংশও রিটার্ন জমা দিচ্ছে না। এমন আরও অনেক কর ফাঁকির কথা আইনজীবীরাও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানিয়েছেন।

তবে কারও যদি একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকে, সেসব অ্যাকাউন্টে যদি তারা লেনদেন করে থাকেন, তাহলে সেইসব অ্যাকাউন্টের তথ্যও আয়কর বিবরণীতে সংযুক্ত করতে হবে।

টাকা

ছবির উৎস,GETTY IMAGES

ছবির ক্যাপশান,

কর ফাঁকি রোধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে করদাতাদের ব্যাংক হিসাবের তথ্যে সরাসরি প্রবেশাধিকার চেয়েছে।

অনেক সময়, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রেমিটেন্স পাঠিয়ে থাকেন, যিনি রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন তিনি যদি রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় হন, অথবা স্বামী বা স্ত্রী হন, তাহলে ওই অর্থের ওপর কোন আয়কর হবে না।

কিন্তু রক্তের সম্পর্কের বাইরে কেউ রেমিটেন্স পেলে বা বিদেশ থেকে অ্যাকাউন্টে অর্থ আসলে তার ওপর আয়কর প্রযোজ্য হবে। কেননা তখন সেই অর্থকে আয় বলে বিবেচনা করা হবে।

ব্যাংক হিসেবের মাধ্যমে ঋণ নিলে এর ওপর কোন আয়কর আরোপ হবে না। তবে শর্ত হচ্ছে সেই ঋণ তিন বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে অথবা পরবর্তীতে নবায়ন করতে হবে।

সবশেষ আয়কর নীতিমালা অনুযায়ী, পুরুষদের ক্ষেত্রৈ কারও যদি বার্ষিক আয় সাড়ে তিন লাখ টাকা বা তার কম হয় তাহলে মোট আয়ের উপর কোন আয়কর দিতে হবে না। নারীদের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ ৪ লাখ টাকা।

তবে আয় বার্ষিক সাড়ে তিন লাখের বেশি হলে (নারীদের ৪ লাখ) মোট আয়ের পরবর্তী এক লাখ টাকার উপর ৫%, পরবর্তী তিন লাখ টাকার ওপর মোট আয়ের ১০% আয়কর দিতে হবে।

পরবর্তী ৪,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ের উপর ১৫% আয়কর এবং পরবর্তী ৫,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ের উপর ২০% আয়কর দিতে হবে।

অবশিষ্ট মোট আয়ের উপর ২৫% আয়কর দিতে হবে। সাধারণত মাসিক আয় পঁচিশ হাজার টাকা বা তার বেশি হলে, বা বেসিক আয় ১৬ হাজার টাকা বা তার বেশি হলে আয়করের আওতাভুক্ত হয়ে পড়ে।

নারী করদাতা এবং ৬৫ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সী করদাতার করমুক্ত আয়ের সীমা হবে চার লাখ টাকা। তৃতীয় লিঙ্গ, প্রতিবন্ধী করদাতার করমুক্ত আয়ের সীমা হবে চার লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। গেজেট-ভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা করদাতার করমুক্ত আয়ের সীমা হবে পাঁচ লাখ টাকা।

কোন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পিতামাতা বা আইনানুগ অভিভাবকের প্রত্যেক সন্তান ও পোষ্যের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা ৫০ হাজার টাকার বেশি হবে। তবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বাবা ও মা দুজনই করদাতা হলে, যেকোনো একজন এই সুবিধা ভোগ করবেন।

ব্যাংকনোট

ছবির উৎস,GETTY IMAGES

এদিকে, ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকে পাঁচ লাখ টাকার বেশি হিসাব খুলতে এখন থেকে রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতর ও সরকারি গেজেট অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্র ও ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক হিসাবে পাঁচ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থ আইন, ২০২২-এর ৪৮ ধারা যথাযথ পরিপালনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

যদি ব্যাংক হিসাবে জমা টাকার পরিমাণ ১০ লাখ টাকা অতিক্রম করে তাহলে ব্যাংকে রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র দিতে হবে।

সেইসাথে পাঁচ লাখ টাকার বেশি ব্যাংক ঋণ আবেদনে বা ক্রেডিট কার্ড নেয়ার ক্ষেত্রেও রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র দিতে হবে।

ব্যাংকে আমানত থেকে যে সুদ আয় হয়ে থাকে, রিটার্ন জমা দেয়া হলে ১০ শতাংশ হারে উৎস কর কেটে রাখে ব্যাংক। কিন্তু রিটার্ন জমা না দেয়া হলে ১৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে রাখবে।

এদিকে নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকে টাকা রাখলে কর কেটে রাখে সরকার। একে বলা হয় আবগারি শুল্ক বা এক্সাইজ ডিউটি। বছর শেষে আমানতকারীদের আ্যকাউন্টে যে পরিমাণ স্থিতি থাকে তার বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা কেটে রাখে ব্যাংকগুলো।

পরে কেটে রাখা অংশ সরকারি কোষাগারে জমা হয়। কারও ব্যাংক হিসাবে সঞ্চিত টাকার পরিমাণ নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে প্রযোজ্য হারে ওই টাকা আবগারি শুল্ক হিসাবে কেটে নেয়া হয়।

সাধারণত একজন গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত যদি এক লাখ টাকার কম জমা থাকলে কোনও আবগারি শুল্ক আরোপ করা হয় না।

তবে এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ পর্যন্ত টাকা থাকলে ১৫০ টাকা এবং পাঁচ লাখ থেকে ১০ লাখ পর্যন্ত থাকলে ৫০০ টাকা আবগারি শুল্ক দিতে হয়।

এ ছাড়া ১০ লাখ থেকে এক কোটি টাকায় তিন হাজার টাকা। এক কোটি থেকে পাঁচ কোটি টাকায় ১৫ হাজার টাকা এবং পাঁচ কোটি টাকার ওপরে থাকলে ৪০ হাজার টাকা আবগারি শুল্ক আরোপ হয়।

প্রতিবছর সঞ্চয়ী হিসাব থেকে আবগারি শুল্ক কেটে রাখে ব্যাংক। মূলত জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাসের সঞ্চয়ের উপর ভিত্তি করে আবগারি শুল্ক কেটে নেয়া হয়।

অর্থনীতিতে অংশীদার ৫ ইউরোপ বড় বাজার, সামনে দুশ্চিন্তা

অর্থনীতিতে অংশীদার ৫ ইউরোপ বড় বাজার, সামনে দুশ্চিন্তা

 বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ৪৫ শতাংশই যায় ইইউর ২৭ দেশে। সামনে আসছে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শ্রম অধিকারের চ্যালেঞ্জ। 


ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলো বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বড় বাজার। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৪৫ শতাংশ আসে ইইউ থেকে। বছর বছর এই রপ্তানি আয় বেড়েছে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে।

স্বল্পোন্নত দেশে থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটলে এই শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। তখনকার জন্য প্রযোজ্য ‘জিএসপি (অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য–সুবিধা) প্লাস’ পেতে হলে বাংলাদেশকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শ্রম অধিকার ও পরিবেশগত বিভিন্ন শর্ত পূরণ করতে হবে। বাংলাদেশ সেই সব শর্ত পূরণে সক্ষম হবে কি না, সরকার শর্ত পূরণে পদক্ষেপ নিচ্ছে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশের কূটনীতিকেরা বিভিন্ন সময় বলেছেন, জিএসপি প্লাস পেতে হলে বাংলাদেশকে দুই ডজনের বেশি আন্তর্জাতিক সনদ মেনে চলতে হবে। তার মধ্যে অন্যতম নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ (আইসিসিপিআর), সেখানে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক অধিকারচর্চার বিষয়গুলো রয়েছে। 


কূটনীতিকেরা আরও বলেছেন, আগামী নির্বাচন যদি সুষ্ঠু ও অবাধ হয়, তাহলে তা বাংলাদেশেকে জিএসপি প্লাস অর্জনের ক্ষেত্রে এগিয়ে দেবে। তবে সুষ্ঠু নির্বাচনের পাশাপাশি আরও অনেক শর্ত রয়েছে।

বাংলাদেশ সেসব শর্তের ক্ষেত্রে যে ভালো অবস্থায় নেই, তা বোঝা যায় ইইউর অবস্থান দেখে। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতিতে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে গত সেপ্টেম্বরে একটি প্রস্তাব কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়। প্রস্তাবটিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারচর্চার বিষয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তি মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়। 

জিএসপি প্লাস সুবিধা না পেলে দেশের শীর্ষ রপ্তানি পণ্য পোশাকের ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা জানতে চাইলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোস্তাফিজ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘জিএসপি সুবিধা না থাকলে ইইউর বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ধস নামবে। কারণ, বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে দাম ১-২ শতাংশ কমবেশির কারণে আমরা ক্রয়াদেশ হারাই। সেখানে জিএসপি সুবিধা না থাকলে শুল্কের কারণে তৈরি পোশাকের দাম ১০-১২ শতাংশ বেড়ে যাবে। এই বাড়তি দাম কেন দিতে চাইবে ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান।’ 

রপ্তানি বেশি, আমদানি কম

বিশ্বের কিছু দেশ ও অঞ্চলে বাংলাদেশের রপ্তানি বেশি, কিন্তু আমদানি কম। মানে হলো ওই সব দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ভারসাম্য বাংলাদেশের অনুকূলে। এ তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইইউ। চীন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বেশি। রপ্তানি কম, আমদানি। 

ইউরোপের ২৭টি দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোট ইইউতে বাংলাদেশ ২৫ বিলিয়ন বা আড়াই হাজার কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। বিপরীতে আমদানির পরিমাণ ৪০০ কোটি ডলারের কম।

একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি সবচেয়ে বেশি। আর জোটগতভাবে সবচেয়ে বড় বাজার ইইউ।

ইইউ থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৯৩ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক থেকে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইইউতে বাংলাদেশ ২ হাজার ৩৫৩ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা দেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৫০ শতাংশ। শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ায় গত দুই দশকে ইউরোপে পোশাক রপ্তানি শক্ত অবস্থানে পৌঁছেছে। 

তৈরি পোশাক ছাড়াও ইইউতে হোম টেক্সটাইল, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, বাইসাইকেল ইত্যাদি পণ্য রপ্তানি হয়। বাংলাদেশ অস্ত্র ছাড়া সব পণ্যই বিনা শুল্কে রপ্তানি করতে পারে।

ইইউভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার জার্মানি। দেশটিতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭০৮ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। এরপর রয়েছে স্পেন (৩৬৮ কোটি ডলার), ফ্রান্স (৩২৯ কোটি), ইতালি (২৩৯ কোটি), নেদারল্যান্ডস (২০৯ কোটি) এবং পোল্যান্ড (১৮৫ কোটি ডলার)।

ইইউ থেকে বাংলাদেশের আমদানি তুলনামূলক কম। ইউরোপীয় কমিশনের তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশ ইইউ থেকে আমদানি করে ৩৬০ কোটি ইউরোর পণ্য। ফলে বাংলাদেশের অনুকূলে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২০ কোটি ইউরো। 

ইইউ থেকে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। ২০২২ সালে বাংলাদেশে ইইউভুক্ত দেশগুলো থেকে বাংলাদেশে ৬৩ কোটি ডলারের বিনিয়োগ এসেছে, যা মোট বিনিয়োগের প্রায় ১৭ শতাংশ। বিনিয়োগ বেশি এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে, তৃতীয় ইইউ।

জিএসপি প্লাস কি পাবে বাংলাদেশ

সবকিছু ঠিক থাকলে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটবে ২০২৬ সালে। এরপর আরও তিন বছর ইইউর বাজারে জিএসপি সুবিধা থাকবে। অর্থাৎ ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাজারটিতে পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে। অবশ্য এরপর শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে চাইলে বাংলাদেশকে জিএসপি প্লাস ব্যবস্থার জন্য যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।

ইইউর বাজারে এখন শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, উজবেকিস্তান, বলিভিয়াসহ আটটি দেশ জিএসপি প্লাস সুবিধা পায়। আর বাংলাদেশসহ ৪৬টি স্বল্পোন্নত দেশ জিএসপি সুবিধা পাচ্ছে।

২০২৪-২০৩৪ সময়ের জন্য জিএসপির নতুন নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত করেছিল ইউরোপীয় কমিশন। খসড়ার ওপর আলোচনা শেষ না হওয়ায় ইইউ পার্লামেন্ট বর্তমান নীতিমালাটির মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করে। 

জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার জন্য খসড়ায় যেসব শর্ত রয়েছে, তা অনুমোদিত হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সুবিধা আটকে যেত। যেমন খসড়ায় জিএসপি সুবিধার আওতায় পণ্য রপ্তানির হিস্যা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। কোনো দেশ তার বেশি রপ্তানি করলে সুবিধাটি পাবে না। বাংলাদেশ ওই নির্দিষ্ট সীমার চেয়ে বেশি রপ্তানি করে। 

রপ্তানিকারক ও বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা বলছেন, খসড়াটি চূড়ান্তের সময় হিস্যাবিষয়ক সীমা যদি শিথিল করা হয়, তাহলে বাংলাদেশ জিএসপি প্লাস সুবিধার যোগ্য হবে। তখন সামনে আসবে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শ্রম অধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষাসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ মেনে চলার বিষয়টি। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ভালো অবস্থানে এখনো নেই। 

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইইউ আমাদের মতো বড় তৈরি পোশাক সরবরাহকারী দেশের প্রতি সহানুভূতিশীল। যদিও জিএসপি প্লাস পেতে শ্রম অধিকার, উন্নত কর্মপরিবেশ ও পরিবেশগত ইস্যু (বিষয়) গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ইইউ বর্তমানে পরিবেশগত ও সামাজিক সুশাসনে জোর দিচ্ছে।’

আবদুর রাজ্জাক আরও বলেন, জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে যেসব বিষয়ে শঙ্কা আছে, সেগুলো বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে। তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্যে জিএসপি প্লাস পেতে হলে রাজনৈতিকভাবে আলোচনা করতে হবে। ধারাবাহিকভাবে ইইউর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। 

অর্থনীতিতে অংশীদার ৬: জাপান আমদানি ও বিনিয়োগ বেশি, রপ্তানি কম

অর্থনীতিতে অংশীদার ৬: জাপান আমদানি ও বিনিয়োগ বেশি, রপ্তানি কম

স্বাধীনতার পর থেকে গত ২০২১–২২ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশকে প্রায় দুই হাজার কোটি মার্কিন ডলার অর্থসহায়তা দিয়েছে জাপান। এককভাবে বাংলাদেশকে অর্থসহায়তাকারী শীর্ষ দেশ জাপান।

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে এগিয়ে জাপান। উন্নত অনেক দেশে বাংলাদেশ রপ্তানি বড় পরিমাণে বাড়াতে পারলেও জাপানের ক্ষেত্রে তা হয়নি। রপ্তানি আয়ের বড় অংশই আসছে পোশাক খাত থেকে। গত ২০২১–২২ অর্থবছরে জাপানে ১৩৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। এ রপ্তানির বিপরীতে গত অর্থবছরে জাপান থেকে আমদানি হয়েছে ২৭৭ কোটি ডলারের পণ্য। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে জাহাজ, বোর্ড, লোহা ও ইস্পাত, গাড়ি, শিল্পের যন্ত্রপাতি, চশমা, ফটোগ্রাফি ও সিনেমাটোগ্রাফির যন্ত্রপাতি ইত্যাদি।


জাপানি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী—বিভিন্ন জরিপে এমন তথ্য উঠে এলেও দেশটি থেকে বিনিয়োগ এখনো কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত জাপানি বিভিন্ন কোম্পানি বাংলাদেশে প্রায় ১০৭ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ করেছে। দেশে কর্মরত জাপানি কোম্পানির সংখ্যা তিন শতাধিক।জাপানি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এখন নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে এক হাজার একর জমির ওপর গড়ে তোলা হচ্ছে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চল। বিশেষ এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ শেষ হলে জাপান থেকে বড় বিনিয়োগ আসবে, এমন প্রত্যাশা করা হচ্ছে। জাপানের সুমিতমো করপোরেশনের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) যৌথভাবে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে।

বিশ্লেষকেরা বলেন, চীনে পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে জাপানের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। জাপানি বিনিয়োগে গড়ে ওঠা এসব কোম্পানির কারণে বিশ্ববাজারে পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষে রয়েছে চীন। জাপান এখন চীন থেকে তাদের কারখানা সরিয়ে নিচ্ছে। জাপানি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ হতে পারে।

বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারি গড়ে তুলতে আগ্রহী জাপান সরকার। সম্প্রতি দেশটির প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা এ আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপানি সহায়তা ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ এ দেশে বাড়লেও দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যঘাটতি কমাতে উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। তাই পোশাকের বাইরে জাপানে রপ্তানির সম্ভাবনা আছে, এমন পণ্য উৎপাদনের দিকে নজর দিতে হবে বলে মনে করেন তাঁরা।

জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য খুব বেশি না বাড়ার কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপানে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি রপ্তানি করে তৈরি পোশাক। তবে জাপান মূলত উচ্চ মূল্যের মানসম্মত পোশাক আমদানি করে। এ ছাড়া দেশটির ভোক্তারা এখন কৃত্রিম তন্তুর পোশাক বেশি ব্যবহার করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ স্বল্প দামি পোশাকই বেশি রপ্তানি করে থাকে। এ কারণে জাপানের বাজারে পোশাক রপ্তানিতে খুব বেশি সুবিধা করতে পারছে না বাংলাদেশ।

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাপান আমাদের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু। তা সত্ত্বেও আমরা দেশটিতে রপ্তানিতে ভালো করতে পারছি না, কারণ তারা যে ধরনের পোশাক আমদানি করে, আমাদের দক্ষতা সেখানে কম। পোশাকের বাইরে তেমন কোনো পণ্যও আমরা জাপানে রপ্তানি করি না।’

মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের বড় ধরনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা বিগ–বি–কৌশলের আওতায় দেশটি মাতারবাড়ীতে বড় বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে এসেছে। বিগ–বি সুবিধাকে কাজে লাগাতে পারলে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি আরও বাড়বে।

দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭–১৮ অর্থবছরে জাপান-বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশের আমদানি ছিল ১৮৭ কোটি ডলারের, আর রপ্তানি ১১৩ কোটি ডলার। করোনাভাইরাস মহামারির পর জাপান থেকে পণ্য আমদানি বেড়ে যায়, তবে সেই গতিতে রপ্তানি বাড়েনি। ফলে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যঘাটতি বেড়ে যায় বাংলাদেশের। করোনার পর ২০২০–২১ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩১৮ কোটি ডলারে। এর মধ্যে আমদানির পরিমাণ ছিল ২০০ কোটি ডলারের আর রপ্তানি ১১৮ কোটি ডলারের।

জাপান থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশই আসে পোশাক খাত থেকে। পোশাকের বাইরে রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং চামড়াবিহীন জুতা।

তবে গত ২০২২–২৩ অর্থবছরে জাপানে রপ্তানি বেশ খানিকটা বেড়েছে। এ বছর ১৯০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে দেশটিতে। তার মধ্যে প্রায় ১৬৩ কোটি ডলারই আসে পোশাক ও বস্ত্র খাতের রপ্তানি থেকে। তার আগের বছর, অর্থাৎ ২০২১-২২ অর্থবছরে এই বাজারে ১০৯ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ।

ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টারের তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালে জাপান বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করে। সেই হিসাবে এই বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি খুবই নগণ্য।

তবে শুধু পোশাকনির্ভরতার মাধ্যমে জাপানে রপ্তানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানোর ব্যাপারে খুব বেশি সম্ভাবনা দেখছেন না ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা। তাই তাঁরা এ দেশে জাপানের বিনিয়োগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, দেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়িয়েই জাপানের বাজারে রপ্তানি বাড়াতে হবে।বিনিয়োগে আগ্রহ জাপানের

গত আগস্টে বাংলাদেশসহ এশিয়া এবং ওশেনিয়া অঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনাকারী জাপানি কোম্পানিগুলোর মতামতের ভিত্তিতে ব্যবসা পরিস্থিতিবিষয়ক একটি সমীক্ষা করে জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো)। এতে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী ২১৪টি জাপানি কোম্পানি অংশ নেয়। সমীক্ষাটির ফলাফল গত আগস্টে প্রকাশ করা হয়।

ওই সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৭২ শতাংশ জাপানি কোম্পানি বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা জানায়। ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রধান কারণ হিসেবে কোম্পানিগুলো উল্লেখ করে, এ দেশে ব্যবসার খরচ এখনো কম।

জাপানি কোম্পানিগুলো এ–ও জানিয়েছে, বাংলাদেশে পণ্য উৎপাদন খরচও কম। জাপানে যে পণ্য উৎপাদনে ১০০ ডলার খরচ হয়, সেখানে বাংলাদেশে সেই পণ্য উৎপাদনে খরচ ৬০ শতাংশ কম।

অসন্তোষ ব্যবসার পরিবেশে

তবে জেট্রোর জরিপে অংশ নেওয়া জাপানি কোম্পানিগুলো ব্যবসার পরিবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুটি বিষয়ে তাদের অপছন্দের কথা জানিয়েছে। প্রথমটি ব্যবসার অনুমোদন ও সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে দক্ষতার ঘাটতি, দ্বিতীয়টি করব্যবস্থার অদক্ষতা। প্রায় ৮০ শতাংশ জাপানি কোম্পানি মনে করে, এ দেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। আর ৭৩ দশমিক ৪ শতাংশ জাপানি কোম্পানি মনে করে, করব্যবস্থার অদক্ষতা ব্যবসার ক্ষেত্রে এ দেশে বড় বাধা। এ ছাড়া বিদেশি মূলধনের আইনি কাঠামো বা ভিত্তি তৈরি এবং বিদেশিদের ভিসা ও কাজের অনুমতি (ওয়ার্ক পারমিট) প্রাপ্তির জটিলতাও বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা বলে জাপানি কোম্পানিগুলো মনে করে।

জাপানি কোম্পানি এখন ৩৫০–এর বেশি

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় জাপানি বিনিয়োগ এসেছে ২০১৮ সালে। ওই বছর প্রায় ১৪৮ কোটি ডলারে বাংলাদেশি একটি তামাক পণ্যের কোম্পানি কিনে নেয় জাপান টোব্যাকো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানির সংখ্যা ছিল ১৮৩টি। চলতি বছরের জুন শেষে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫০টিতে। বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানিগুলোর সর্বোচ্চ বিনিয়োগ রয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে, প্রায় ২০ কোটি ডলার। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রায় সাত কোটি ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে নির্মাণ খাতে।

বর্তমানে জাপানের সহায়তায় কক্সবাজারের মহেশখালীতে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, ঢাকায় মেট্রোরেলের মতো বেশ কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প নির্মাণাধীন রয়েছে।

জাপানের সঙ্গে বাণিজ্যঘাটতি ও বিনিয়োগ সম্ভাবনায় বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার কারণ জানতে চাইলে জাপান–বাংলাদেশ চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায় যেভাবে জাপানি বিনিয়োগ বেড়েছে, বাংলাদেশে সেভাবে বাড়েনি। তার বড় কারণ, আমাদের বিনিয়োগ পরিবেশ কম উন্নত। দেশের ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন যতটা হয়েছে, ব্যবসা সহায়ক পরিবেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নতি সেভাবে হয়নি। অনেক দেরিতে হলেও আমরা জাপানের জন্য আলাদা অর্থনৈতিক অঞ্চল করছি। বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি হলে এ দেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়বে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যেরও উন্নতি হবে।’